English | বাংলা
Logo
 

 

সংগঠন বন্ধুত্ব বিপ্লব: এ রেভোলিউশন টু লিভ

দৈনিক বণিক বার্তা, ঢাকা, ২০-০৪-২০১৩



হাবিবুজ্হামান চুনী
 
 
অচেনা দাগ
তেত্রিশতম অধ্যায়
 
 

 

আমাদের আত্মবলিদান দরকার যে বিপ্লবের তা আসলে আব্বুদের বিপ্লব
প্যারিস-বসন্ত, ১৯৬৮-র অন্যতম দেয়াল-লিপি (কেন ন্যাব, ২০০৬)

 

৩৩.১ এ রেভোলিউশন টু লিভ
 

সম্প্রতি একটা লেখা লিখেছিলাম। রচনাটার আদি সংক্ষিপ্ত পাঠ ছাপা হয়েছিল রাজশাহীর দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকার গত ৫ই এপ্রিল শুক্রবারের সংখ্যায়। কিন্তু আমারই গাফেলতিজনিত সময়াভাবে সেখানে কিছু টুকটাক বানান-বাক্য সমস্যা থেকে গিয়েছিল। পরে তার পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত পাঠ দিতে চেয়েছিলাম ফেসবুক -নোট আকারে। দিতে গিয়ে দেখি লম্বা হয়ে গেছে। ফেসবুকে স্বতন্ত্র একটা নোট হিসেবে আঁটলো না। তাই আমার নিজের ওয়েবসাইট থেকে ফেসবুকে শেয়ার দিতে হয়েছিল। দৈনিক সোনার দেশের ঐ লেখাটার শিরোনাম ছিল: ‘স্বাধীনতা সহিষ্ণুতা চিন্তাপুলিশ’। ফেসবুকে শেয়ার দেওয়ার সময় দেখলাম সেটা ঠিক যুৎ লাগছে না। তাই সেটাকে পাল্টে দিয়ে করলাম: ‘স্বাধীনতা সহিষ্ণুতা সংগঠন’। তো যা-ই হোক, আরো অনেকের পাশাপাশি সদাসঙ্গী সুস্মিতা চক্রবর্তীও ঐ লেখাটার ফেসবুক-লিংক তাঁর স্ট্যাটাসে শেয়ার করেছিলেন। শেয়ার করার সময় সুস্মিতা তাঁর স্ট্যাটাসে নিচের অংশটুকুর উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন আমার লেখাটা থেকে:
 
... ‘হয় বিপ্লব না হয় মৃত্যু’র সাথে ‘মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী’র পাথর্ক্য কোথায়? বিশেষত তরুণদেরকে তাই সতর্ক হতে হবে বৈকি। যিনি জানেন না সামনের দিনগুলোতে কী করে আন্দোলন-সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যিনি জানেন না নতুন সমাজের জন্য লাগাতার অজস্রমুখী কাজ কীভাবে করতে হয়, যিনি জানেন না প্রচলিত রাজনৈতিক ভণ্ডামীর বিকল্প তৎপরতার ভিশন কী হতে পারে, তাঁরা মরার আবেগের রাজনীতি ছাড়া পথ দেখেন না। কিন্তু এখন আসলে মরার টাইম নাই। মরার জন্য বিপ্লব অনেক হয়েছে। সামনের দিনের বিপ্লব হবে বেঁচে থাকার বিপ্লব: ‘এ রেভোলিউশন টু লিভ!’
 
সুস্মিতার শেয়ার করা সেই স্ট্যাটাস-লিংকের নিচে মন্তব্যের ঘরে ‘বাঁচা-মরা’ নিয়ে আমার পুরোনো বন্ধু হাবিবুজ্জামান চুনীর টুকরা কয়টা কথা ধরে আজকের এই রচনা। উপলক্ষ সামান্য। কিন্তু তাৎপর্য সামান্য নয়।
 

৩৩.২ ব্যারিকেড ও বন্ধুত্ব


সুস্মিতার দেওয়া ওপরে বর্ণিত আমার উদ্ধৃতিটার পরিপ্রেক্ষিতে চুনী বলছিলেন: ‘সবার বাঁচার জন্য কাউকে কাউকে মরার ঝুঁকি নিতে হয়’। চুনী আমার দীর্ঘদিনের একান্ত বন্ধু। আমরা তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। আমি নাটোরে। চুনী রাজশাহীতে। দুজনেই ছাত্র ইউনিয়ন করি। সেই সূত্রে পরিচয় ছিলই। আবার, আমরা দুজনেই সিপিবি করতাম। নাটোর-সিপিবি তখনও জেলা-পার্টির মর্যাদা পায় নি। নাটোর-পার্টি ছিল তখন রাজশাহী জেলা সিপিবি’র অধীনস্ত। তো সেই সময় রাজশাহী-সিপিবি একটা বড়ো প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। সেখানে নাটোর থেকে অন্যদের সাথে আমিও যাই। আর সেখানেই বন্ধুত্ব হয় বাবু আর চুনীর সাথে। গোটা আশির দশক আমাদের প্রজন্মের কেটেছে সামরিক বুটের তলায়: ব্যরিকেডে আর বন্ধুত্বে।
 
শরীফুল ইসলাম বাবু ছিলেন রাজশাহী জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। পরে রাজশাহী কলেজের দুর্দান্ত জনপ্রিয় ভিপি। এখন দীর্ঘকাল ধরে তিনি রাজশাহীর সাহেববাজার এলাকার ব্যাপক জনপ্রিয় কাউন্সিলর এবং বাকি ৩০টা ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচি প্যানেল-মেয়র। বাবু এখন কোনো রাজনৈতিক দল করেন না। আর চূনী ছিলেন রাজশাহী জেলা ছাত্র ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। রাজশাহী মেডিকেলের খালেক ভাই, পিংকু দা (পিনাকী ভট্টাচার্য, ছাত্র ইউনিয়নের দাপুটে নেতা হিসেবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের তখনকার ভিপি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলালউদ্দিন, আব্রাহাম লিংকন, হাসিব ভাই, মুকুল ভাই, এবং আরো এক গাদা অতি-উজ্জ্বল নেতাকর্মীতে তখন রাজশাহী-পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন গিজগিজ করছে। তার মধ্যে বাবু-চুনী এরশাদের পতন পর্যন্ত রাজশাহীর ঘাঁটি আগলে রেখেছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপে অসাধারণ প্রজ্ঞায়। বাবুর প্রতাপ আর চুনীর প্রজ্ঞা ছিল তাকিয়ে দেখার মতো ব্যাপার। আর আমি তত দিনে ঢাকায়। ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলী পার হয়ে সিপিবি-কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন ছাত্র-সাব কমিটির সদস্য।
 
পরে আবার যখন আমি রাজশাহীতে ফিরলাম, বাবু তখনই জনপ্রিয় কমিশনার। চুনী ব্যবসা কর্মে সিরিয়াস। আমি সিপিবি’র জেলা কমিটির সহসভাপতি (কার্যত সভাপতি, কেননা সভাপতি থাকতেন পুঠিয়ায়, তাঁর বয়স তখন ৭৩, চলাফেরা তেমন করতে পারেন না), আর বাবু পার্টির নেতৃত্বের নানবিধ কর্মকাণ্ডে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে দূরে সরার পথে। জনপ্রতিনিধিত্ব করে আলাদা সময়ও পান না মোটে। তবু তখনও তিনি জেলা-পার্টির সম্পাদকমণ্ডলীর মহাগুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
 
সামরিক আইন বিদায় করে তারপর আমরা সবাই আস্তে আস্তে ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়লাম। পার্টি ছাড়লাম। কিন্তু বন্ধুত্ব গেল না। বাবু তো এখনও রাজশাহীতেই, বলেছি। ব্যবসার কাজে বহুদিন ধরে সারা বাংলাদেশ চরকি মেরে অবশেষে চূনী এখন ঢাকায়। ব্যবসায় আরো সিরিয়াস। প্রায় ফুলটাইম। দেখা-সাক্ষাৎ আমার সাথে হয়ই না বলতে গেলে। মাঝেমধ্যে কথা হয় বৈকি। কণ্ঠস্বর বলে দেয় সেই চুনীই আছে। নিউটনও নিউটনই – কিন্তু বিশেষত চিন্তাধারা বাঁক নিয়েছে বিপুলভাবে। তার পুরোটা খবর আমার পুরোনো বন্ধুদের প্রায় কেউই পুরোটা রাখতে পারে নি। কারণ আমার লেখাগুলো ছাপা হচ্ছিল, হয় কোনাকাঞ্চিতে। বইও বার করতে পারি নি। চুনী যত দিন ছিলেন ততদিন বাবু-চুনী, আর এখন বাবু আর তাঁর অজস্র বন্ধুকে রাজশাহীতে আমার সম্পদে-বিপদে পাশে পাই।
 
৩৩.৩ রক্তপাত, মর্ষকামিতা ও পুরোনো দিনের বিপ্লব

এবার মনে মনে সামনে বসিয়ে বন্ধু চুনীর সাথে কথা বলতে বলতে লেখাটা আগাবো। সুস্মিতার দেওয়া ওপরের ঐ উদ্ধৃতিটার পরিপ্রেক্ষিতে চুনী তুমি বলছিলে: ‘সবার বাঁচার জন্য কাউকে কাউকে মরার ঝুঁকি নিতে হয়’। এর উত্তরে আমি লিখেছিলাম:
 
মরার ঝুঁকি তো সারা বছর ধরেই আছে। শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই যথেষ্ট। মানুষ তো মরবেই। কিন্তু মর্ষকামিতা অন্য জিনিস। এ হলো মৃত্যুকে মহিমান্বিত করা। মরার জন্য অন্যকে উৎসাহিত করা। যেন সের দরে রক্ত ঢেলে দিলেই ‘বিপ্লব’ গজিয়ে উঠবে। বিপ্লব রক্ত দিয়ে হয় না। চিন্তা দিয়ে হয়। এবং চিন্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ চর্চার মধ্য দিয়ে।
 
তখন তুমি লিখলে:
 
আর একটা কথা বলি, আশা করি তুমি ব্যক্তিগতভাবে নেবে না। কিছু মানুষের রক্ত দেয়ার ফলে এই আজ তুমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে নৈরাজ্যবাদের চর্চা করতে পারছ।
 
না। একদম খারাপ অর্থে নিই নি, চুনী। ভালো লেগেছে। তোমার এই কথা যুক্তিপূর্ণ। ষোলো আনা সত্য। কিন্তু একটু খেয়াল করবে প্লিজ: আমি কিন্তু ‘মরার ঝূঁকি’কে অস্বীকার করি নি। ব্যক্তিগতভাবে আমিও মরার ঝুঁকিতে বহুকাল ধরে ছিলাম, তুমি জানো, এখনও আছি। বর্তমান পৃথিবীতেও, চিরকালই, স্বাধীনতা-পিপাসুরা তো রক্ত দিয়েই চলেছেন। অত্যাচার, বিষোদ্গার, কারাগার নিয়েই তো তাঁরা যথাসম্ভব স্বাধীন আছেন। রাষ্ট্রশক্তি, ভাইস-চ্যান্সেলর, মাফিয়া-রাজনীতির হুমকিকে মোকাবেলা করেই তাঁরা আছেন। বলপ্রয়োগের আর হুকুমতন্ত্রের এই বদ্ধচিন্তার সমাজে কেউ স্বাধীনতার চর্চা করবেন আর কোনো মূল্য দিতে হবে না – তাই কখনও হয়? স্বাধীনতার সাধকদের জন্য মৃত্যু কোনো ঘটনা না। মৃত্যু কোনো তারিখ উদযাপনের উপলক্ষ্য না। মৃত্যু কোনো ভাষ্কর্য নির্মাণের পুরষ্কারপ্রাপ্তিও নয়। মৃত্যুর ঝুঁকি তাঁদের স্বাধীনতার গ্যারান্টি মাত্র।
 
বিপ্লবের জন্য রক্ত দেওয়া হারাম – আমি তাও বলি নি। আমি নিন্দা করেছি ‘মর্ষকামিতা’র, ‘মরার আবেগের রাজনীতি’র। নিন্দা করেছি ক্ষমতার লোভে কর্মী-দেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে ‘মৃত্যুকে মহিমান্বিত’ করে নেতাদের আজীবন বেঁচে থাকার বাসনার। এই মর্ষকামিতা নিয়ে কিছু বলবে কি?
 
তথাকথিত অক্টোবর বিপ্লবের জন্য (যা ছিল আসলে অলরেডি সংঘটিত সামাজিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে লেনিনীয় রাজনৈতিক প্রতিবিপ্লব) লেনিনকে মরতে হয় নি। পরে না মারা গেলে তিনি সুরক্ষিত ক্ষমতায়ই থাকতেন আজীবন। (তাঁকে প্রতিবিপ্লবের পরে গুলি করা হয়েছিল জাতীয়তাবাদী ক্ষমতা-হানাহানিতে, রুশ জমির বিনিময়ে জার্মানির সাথে ‘শান্তিচুক্তি’ করার অজুহাতে।) চীন-বিপ্লবের জন্য মাও সেতুংকে মরতে হয় নি। কিউবার বিপ্লবের জন্য ক্যাস্ত্রোকে মরতে হয় নি। উনিও আজীবন ক্ষমতায়। চে খুন হয়েছিলেন বটে। তবে বলিভিয়ায় বিপ্লব রপ্তানী করতে গিয়ে। সেটা ছিল বালসুলভ রোমান্টিক একটা অ্যাডভেঞ্চার মাত্র। চে গুয়েভারার ডায়েরি পড়লেই তা বোঝা যায় (চে গুয়েভারা, ২০০৮)1 আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য জীবন দিতে হয় নি শেখ মুজিবকে। তিনিও নিজেকে আজীবন রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে পাওয়া সংবিধানকে কেটে। তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে ক্ষমতার হানাহানিতে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। বাংলাদেশ-বিপ্লব করতে জন্য নয়। আওয়ামী লীগের কয় জন কেন্দ্রীয় নেতা, কয় জন এমপি শহীদ হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে? সিপিবি’র কোনো জেনারেল সেক্রেটারি কোনোদিন সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন?
 
সেলিম ভাই, মঞ্জু ভাই, জামান ভাই, রনো ভাই, মেনন ভাইরাও আজীবন নেতা। এই পার্টিগুলো নাকি ‘মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ’ গঠন করবেন! যাঁদের নিজেদের পার্টিতেই গণতন্ত্র নেই। বাকস্বাধীনতা নেই। এমনকি নেতা হওয়ার স্বাধীনতাও নেই। এমনকি বন্ধুত্বও নেই। নেতারা নিজ দলের কর্মীদেরকেও বিশ্বাস করেন না। উপদল করেন। পার্টি ভাঙেন। ‘চিন্তার ঐক্য, কথার ঐক্য, কাজের ঐক্য’ এঁদের মূলমন্ত্র। এককাট্টা, একশিলা-পার্টির সাধানা এঁদের সাধনা। অথচ বৈচিত্র্য, অটোনমি বা স্ব+অধীনতা, পরস্পর-সহযোগিতা প্রকৃতির ধর্ম। প্রাণের ধর্ম।
 
ক্ষমতার রাজনীতিতে নেতার জীবনের মূল্য কর্মীর জীবনের মূলের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। ক্ষমতার রাজনীতি বলতে আমি লিবারালবাদ-লেনিনবাদ-লাদেনবাদ সবই বুঝাচ্ছি। এঁরা সবাই ভ্যানগার্ডপন্থী। নিজেরা ভ্যানগার্ড, সত্য-আবিষ্কার। আর জনগণ মূর্খ ভেঁড়ার পাল। আর কে না জানেন, ভ্যানগার্ডের জীবনের মূল্য সাধারণ শ্রমিকের জীবনের চেয়ে বেশি। আবার মার্কসীয় তত্ত্বে কারখানা শ্রমিকের মূল্য দোদুল্যমান ‘পেটিবুর্জোয়া’ কৃষি-শ্রমিকের চেয়ে বেশি। এইসব তত্ত্ব নোংরা। এগুলো এক মানুষের ওপর অন্য মানুষের শ্রেয়ত্ব, প্রভুত্ব আর আধিপত্যের পাটাতন তৈরি করে এইসব মর্ষকামী তত্ত্ব।
 
বিপ্লবের জন্য রক্ত দেওয়া হারাম – আমি তা বলি নি বটে, কিন্তু এখন বলছি, বিপ্লবের জন্য যদি সার্বিক চিন্তাভাবনাদর্শনগত সম্মতির বদলে দীর্ঘকালের রক্তপাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, সেই বিপ্লব টেকে না, নতুন শাসকদের (ভেতরের এবং বাইরের) অত্যাচার-জুলুম-কারাগার-রক্তপাতের মধ্য দিয়েই তার ধ্বংস ঘটে। উদাহরণ লাগবে? রাশিয়া, চীন, বাংলাদেশ …
 

৩৩.৪ নৈরাজ্যবাদ নয়: স্বাধীনতা, নৈরাজ্য


তোমার জন্য একটা সংশোধনী, চুনী। আমি নৈরাজ্যবাদের চর্চা করি না। কারণ আমি আরেকটা ডগমা বা অন্ধ-মতবাদ চাই না। আমি সাধনা করি স্বাধীনতা-সাম্য-সংহতি-সৃজনশীলতার ভিত্তিতে মুক্ত মানুষদের মুক্ত সমিতিসমূহকে কেন্দ্র করে গঠিত উন্নত সমাজের। সে সমাজ নৈরাজ্যবাদীরা কায়েম করতে চান না। খোদ জনসাধারণকেই তা কায়েম করতে হয়। জনগণের রক্তের বিনিময়ে নেতা-হুজুর-মোল্লা-ঠাকুর-অধ্যাপক-ব্যবসায়ীদের স্বাধীনতা আমি চাই না। কেননা সাম্য ছাড়া স্বাধীনতা প্রিভিলেজ মাত্র; আর স্বাধীনতা ছাড়া তথাকথিত সাম্য মানে স্রেফ দাসত্ব।
 
নিজেকে আমি নৈরাজ্যবাদী বলি না। তবে আমি নৈরাজ্যের চর্চা করি বটে। নৈরাজ্য একটা পথ। স্বাধীনতা-সাম্য-সংহতি-সৃজনশীলতার পথ। পথ কখনও মুখস্ত পথ হয় না। এই পথ আমাদেরকে সবাইকে মিলে ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করে যেতে হবে। নৈরাজ্য আমার কাছে স্বাধীনতার অপর নাম। নৈরাজ্য স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে একটা স্বাভাবিক-সামাজিক প্রবণতা মাত্র। এটা কোনো থিওরি না। মতবাদ না। রণনীতি-রণকৌশল না। নৈরাজ্যের তাই হাজারো নাম, অজস্র অভিপ্রকাশ: সুফি-সহজিয়া-তন্ত্র-তাও-জেন-বুদ্ধ-জৈন-তলস্তয়-গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ। এসব নিয়ে আমি আমার ‘নয়া মানবতাবাদ ও নৈরাজ্য’ গ্রন্থে (সেলিম রেজা নিউটন, ২০১৩-) আলোচনা করেছি।
 

৩৩.৫ বন্ধুত্ব বৈচিত্র্য বিপ্লব


আরেকটা কথা, চুনী। তুমি লিখেছ: ‘নিউটন, তোমার লেখাগুলো পড়ি, কিন্তু পাবলিকলি আমার মতামত দিতে চাচ্ছি না। বিপ্লবের চিন্তা রক্ত দেওয়া ছাড়া কোথাও কখনো বাস্তবায়ন হয়েছে বলে আমার জানা নাই।’ কিন্তু আমার মতামত নিয়ে পাবলিকলি মতামত দিতে তুমি চাচ্ছ না কেন, বল তো? তুমিও কথা বলো বলো, প্লিজ! প্রকাশ্যেই বলো। কথা তো আমাদের শুরু হয়েইছে। নির্দ্বিধায় চলুক। তোমার সাথে কথা বলতে পারা আমার সৌভাগ্য। প্রকাশ্য আলোচনার চেয়ে ভালো পদ্ধতি খুব বেশি নাই। আমাদের লুকানোর কিছু নাই। মানসম্মানের কিছু নাই। জাত-কুল-মান জলাঞ্জলি না দিলে গৌর পাবে কোথায়? প্রেম হবে কী করে? বন্ধুত্ব থাকবে কী করে? আর পার্টির মধ্যে রেনিগেড হওয়া, পরিবারের মধ্যে অদ্ভুত পদার্থ হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপজ্জনক মাস্টারে পরিণত হওয়া, ব্যবসার মধ্যে বন্ধুত্বের ‘অচিন’ নেটওয়ার্ক রচনা করা কিংবা বন্ধুদের মধ্যে ‘বেয়াড়া প্রশ্রয়’ পাওয়া তো তোমার-আমার জন্য নতুন নয়। তুমি ছিলে আমাদের উজ্জ্বল তত্ত্ববিশারদদের এক জন। রাস্তার সবচেয়ে সাহসী সংগঠকদের এক জন। সেই ছোটবেলা থেকেই, আমার কাছে তোমার মতামতের মূল্য কতোটা তুমি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারো। সেই জন্যই এত কথা বলা। ভিন্নমত সহকারে বন্ধুত্বই তো বন্ধুত্ব। ভিন্নমতবিহীন বন্ধুত্ব তো রোবোটিক চিন্তাপ্যারেড মাত্র। ‘বন্ধু তো সে, যে তোমাকে পেতে দেয় পূর্ণ স্বাধীনতা যেন তুমি হয়ে ওঠো তুমিই নিজে।’2 সুতরাং নাথিং ইজ ইম্পসিবল।
 
আর একসাথে বসে দীর্ঘ আড্ডা মারতে পারলে তো কথাই নাই। তাই না? সেই আড্ডা তো অচিরেই হবে। জম্পেশ হবে। বহুকাল পরে তোমার অসাধারণ প্রাণোচ্ছল, সুতীব্র বন্ধুত্বে সিক্ত হবো আমি। আমার তর সইছে না। চলো সেই আড্ডা আমরা হুবহু রেকর্ড করি এবং ‘আনকাট’ অবস্থায় প্রকাশ করি। আমাদের আড্ডায় আরো বন্ধুরা তাহলে যুক্ত হতে পারবে। আর যদি নিতান্তই সময় না পাও (সময়াভাবের কথা তুমি অবশ্য বলো নি, বলেছ প্রকাশ্যে আলাপ করতে চাও না), তাহলে তো আড্ডা মহান। অরাজপন্থীদের কাছে আড্ডাই সংগঠনের প্রাণ। বিপ্লবের বাস্তব অনুশীলন।
 
আমলাতান্ত্রিক আর উচ্চনিচক্রমকর্তৃত্বওয়ালা হুকুমতান্ত্রিক পার্টির জায়গায় আমাদের চাই মুক্ত বন্ধুত্বের সংগঠন। এ হলো আত্মার বন্ধন। প্রেমের বন্ধন। এ বন্ধন কৃত্রিম পার্টি-সদস্যপদের বন্ধন নয়। ‘চিন্তার ঐক্য, কথার ঐক্য, কাজের ঐক্যের’ চিন্তাপ্যারেড নয়। এ কোনো আরোপিত বন্ধন না। এ হলো বাস্তব সমাজ-সম্পর্করাশির ভেতর থেকে স্বাভাবিক-সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা ‘স্বাভাবিক সংগঠন’ (ন্যাচারাল গ্রুপ)। তথাকথিত ‘অ্যানার্কিস্ট’রা এ নামেই একে ডাকেন। কৃত্রিমভাবে পরস্পরের অপরিচিত লোকজন নিয়ে গায়েবী মতবাদের ওপর ভিত্তি করে আমলাতন্ত্র হতে পারে, সত্যিকারের সামাজিক সংগঠন হয় না। প্রকৃত সামাজিক সংগঠন মানেই তাই স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক সংগঠন। এজন্যই ‘স্বাভাবিক সংগঠন’ (বা ন্যাচারাল গ্রুপ) নামটা আসে।
 
একে কোষ-সংগঠনও (Cell) বলে। স্বাধীন-স্বতন্ত্র-পরস্পরনির্ভর অজস্র কোষ মিলে নতুন সমাজের দেহ গঠন করতে থাকে। কালকে যে নতুন সমাজ যেমন চাই, আজকেই তার চর্চা শুরু করা দরকার। এই কোষগুলো ভবিষ্যতের স্বাধীন সমাজেরই এই মুহূর্তের চর্চা। প্রতিটা কোষ কিন্তু স্বতন্ত্র-স্বাধীন প্রাণসত্তা। প্রতিটা কোষ স্বেচ্ছায় পরস্পরের সহযোগিতা ও সমন্বয়ে চলে। সমন্বয়কারীও কোনো একক কোষ নয়। অজস্র কোষের নিরবচ্ছিন্ন লেনদেনের মধ্য দিয়ে সার্বিক সমন্বয় সাধিত হয়। কেননা মস্তিষ্ক নিজেও কোটি কোটি কোষের সমাহার। প্রত্যেকটা কোষের মঙ্গলামঙ্গলের ওপরই নির্ভর করে গোটা দেহের মঙ্গলামঙ্গল। বিপরীতটা নয়। কেননা কোষ ছাড়া দেহ হয় না। কিন্তু শুধু একটা কোষ নিয়ে দেহ রচিত হতে পারে। কোনো একটা কোষেও যদি কোনো ঝামেলা হয়, পুরো দেহ বিপদের ঝুঁকিতে পড়ে। পুরো দেহ মিলে তখন ঐ কোষটার মেরামতি-চিকিৎসা-যত্নআত্তি নিতে থাকে। ফলে সার্বিক দেহ এবং স্বতন্ত্র কোষের সুরসঙ্গতিই শারীরিক সুস্থতার অপর নাম।
 
নৈরাজ্যিক/নৈরাজ্যপ্রবণ/অরাজক/স্বাধীন সংগঠন এবং সমাজও তাই। ব্যক্তিই সমাজের প্রাণ। ব্যক্তিই সমাজ। কথাটা এমনকি খোদ কার্ল মার্কসেরই। বহু দিন আগে এক লেখায় কোট করেছিলাম। খুঁজলেই পেয়ে যাবো। ব্যক্তি ছাড়া সমাজ হয় না। ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং তাঁর অনুকূল সমাজবিন্যাসের সামাজিক-ব্যক্তিক স্বাধীনতার কনসার্ট রচনা করে। ব্যক্তি ভালো থাকলে সমাজ ভালো থাকে। সমাজ ভালো থাকলে ব্যক্তি ভালো থাকে। কিন্তু ব্যক্তি ছাড়া সমাজই হয় না। অথচ সমাজ-ছাড়া ব্যক্তি এমনকি বনে গিয়েও বাস করতে পারে। কিছু দিনের জন্য হলেও। আর যদি তাঁর একটা মাত্র সঙ্গীও জুটে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। আস্ত একটা নতুন সমাজের পত্তনেরই একেবারে সম্ভাবনা তৈরি হয়।
 
এ ধরনের সংগঠনকে ‘ব্লক’ বলেও ডাকা হয়। অনেকগুলো ব্লক মিলে বৃহত্তর, বহুমাত্রিক ‘দালান’ গড়ে ওঠে। বিল্ডিং ব্লকের মতোই এই ব্লকগুলো পরস্পরের মধ্যে প্রয়োজন ও পছন্দ অনুসারে স্বেচ্ছায় নানান নকশায় বিন্যস্ত-পুনর্বিন্যস্ত হতে পারে। আমাদের প্রাচীন ‘তন্ত্র’ থেকে ধার করে একে ‘চক্র’ও বলা যেতে পারে। চক্র হলো সদাপ্রসারমান সমাজবৃত্তের ছোট ছোট কেন্দ্র। একাধিক বিন্দু নিয়েই বৃত্ত বা চক্র গঠিত হয়। বিন্দু ছাড়া বৃত্ত অচল। ব্যক্তি-বিন্দুর স্বাধীনতার মাত্রাই সমাজ-বৃত্তের স্বাধীনতার মাপকাঠি।
 
এই ধরনের সংগঠনে ৫ থেকে শুরু করে ১৫/২০ জন পর্যন্ত পরস্পর-পূর্বপরিচিত ব্যক্তি নিয়ে এ ধরনের একেকটি সংগঠন গড়ে ওঠে। এই ছোট্ট গ্রুপটাই স্বাধীন-সার্বভৌম একটা সংগঠন। এর সদস্যরা সবাই আগে থেকেই (জন্মসূত্রে, কর্মসূত্রে, পেশাসূত্রে, অবস্থানসূত্রে, পছন্দ-অপছন্দের সূত্রে, আড্ডার সূত্রে) পরস্পরের সাথে বন্ধুত্বে বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। এই সংগঠন বাইরে থেকে তো স্বাধীনই, ভেতর থেকেও স্বাধীন।
 
বাইরের বৃহত্তর নেটওয়ার্ক বা ফেডারেশন কোনো সদস্য-সংগঠনের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। আর কোষ-সংগঠনের ভেতরের কোনো ব্যক্তির ওপর ‘মেজরিটির’ মতা চাপানোর তো প্রশ্নই আসে না। সিদ্ধান্ত হয় সর্বসম্মতভাবে। কোনো মেজরিটি-মাইনরিটির বন্দোবস্ত নাই। ফলে গ্রুপিং নাই। রিক্রুটমেন্ট নাই। কারণ এটা ন্যাচারাল গ্রুপ। এখানে সবাই সবার সাথে সামাজিক সম্পর্কসূত্রে টিউনড। বন্ধুত্বের সূত্রে হারমোনাইজড। রিক্রুটমেন্ট তো করে আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বহিষ্কারও নাই। কারণ কৃত্রিম ‘শৃঙ্খলা’র শৃঙ্খল নাই। আছে স্ব-আরোপিত নীতিবোধ। পারস্পরিক মমত্ববোধ। আর দায়িত্ববোধ। বহিষ্কারের জন্য তো অথরিটি লাগে। আরোপিত নেতা লাগে। মাতব্বর লাগে। এখানে কোনো অথরিটি নাই। সবাই স্বাধীন এবং পরস্পরনির্ভরশীল। কোনো একজনের অমত থাকলেই আর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রত্যেকের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। প্রত্যেকের মতকে অ্যাকোমোডেইট করার জন্য, ধারণ করার জন্য সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কোনো একটা প্রস্তাব ক্রমাগত কম্প্রোমাইজের মধ্যে দিয়ে যায়। বিরামহীন মডিফিকেইশনের মধ্যে যায়। এক পর্যায়ে সর্বসম্মতি আসে। সহজেই আসে।
 
যে প্রশ্নে সর্বসম্মত হওয়া যায় সেটুকুই সংগঠনের সিদ্ধান্ত। আর যেসব প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকে সেসব প্রশ্নে সবাই স্বতন্ত্র। সেসব ক্ষেত্রে নিজের নিজের মতো করে কাজ করা যায়। সংগঠনের চূড়ান্ত দিশাগত প্রশ্নে, সাধারণ মূলনীতি আর বিশ্বাস-সমূহের প্রশ্নে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ কিনা করলেই হলো। কেউ তা করেও না। কারণ এখানে কেউ ক্ষমতাচর্চার জন্য আসে না। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা-কর্তৃত্বের প্রতি বিতৃষ্ণাই এখানে সবার সমবেত হওয়ার আদি ভিত্তি।
 
এটা আসলে বন্ধুত্বের সংগঠন। ভাতৃত্বের সংগঠন। এখানে সবাই সবার স্পন্দন বোঝে। পালস্ বোঝে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের শক্তি আর সীমাবদ্ধতা বোঝে। এখানে কেউ তো মেশিন না! সবাই মানুষ। সবাই তাই সবার আবেগ বোঝে। অকাট্য যুক্তিকে গ্রাহ্য করে। ফলে সংগঠন ভাঙে না। টুকরা টুকরা হয়ে সবাই নিজেকে অভ্রান্ত বলে দাবি করার মূঢ়তা দেখায় না। কেননা সবাই জানে: যাবতীয় মতপার্থক্য সত্ত্বেও এখানে সবাই সবার বন্ধু। সকলেরই উদ্দেশ্য শুভ, মঙ্গল, কল্যাণ, স্বাধীনতা, সাম্য।
 
আর যদি দিনের পর দিন সর্বসম্মত হওয়া না যায়, তাহলে ধরে নিতে হয় এই সংগঠনের সদস্যদের আত্মার বন্ধন টুটে গেছে। কোথায় জানি তার ছিঁড়ে গেছে। সুর কেটে গেছে। কাটা জিনিস, ফাটা সম্পর্ক জোড়া লাগে না। তখন সেই সংগঠনটাকে শত মনোকষ্ট সত্ত্বেও বিলুপ্ত করে দিতে হয়। ঐ সংগঠনের নাম নিয়ে তখন কেউ আর আলাদা কাজ করে না। এটা হাইব্রিড নয়। কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত শঙ্কর-সংগঠন নয়। এ হলো অর্গানিক সংগঠন। জৈবসত্তা। প্রাণের মতো। প্রাকৃতিক-স্বাভাবিক সম্পর্কের মতো। আপনা থেকে গড়ে ওঠা সমাজের মতো।
 
অরাজপন্থীরা প্রায় দুই শ বছর ধরে এ ধরনের সংগঠনের বাস্তব চর্চা করে আসছেন। প্রথম আন্তর্জাতিকের সময় থেকে ইউরোপ জোড়া শ্রমিকদের মধ্যে কোষ-সংগঠন কাজ করেছে। তাঁদের নেটওয়ার্ক, ফেডারেশন, পরে পৃথক ইন্টারন্যাশনাল গড়ে উঠেছে। ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে স্প্যানিশ বিপ্লবের সময় এরকম অজস্র কোষ-সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেগুলোকে বলা হতো ‘জান্তা’।
জান্তা মানে ঐ ‘আড্ডা’ গোছেরই একটা কিছু। স্প্যানিশ ‘জান্তা’র অর্থ কাউন্সিল বা পরিষদ ইত্যাদি স্থানীয় সংস্থা বিশেষ। রুশ ভাষায় এ জিনিসকে বলে ‘সোভিয়েত’। আর বাংলায় একেই বলে পঞ্চায়েত বা সভা বা সমিতি, বা ‘সঙ্ঘ’। প্রকাশান্তরে একেই বলে (গ্রামসি-কথিত) ‘কারখানা কমিটি’। এ থেকেই আসে ‘কাউন্সিল-কমিউনিজম’ এর ধারণা। সাথে বলে রাখি বাংলায় ‘আড্ডা’ শব্দটার মূল অর্থ: ‘সমবেত হওয়া; একসঙ্গে মেলা’; ‘কার্য্যবিশেষের নিমিত্ত তৎসংক্রান্ত লোকদিগের সম্মিলনস্থান’।3

ষাট-সত্তরের দশকের প্যারিস-বসন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে, পরে প্রধানত মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ-আন্দোলন, র‌্যাডিক্যাল নারী-আন্দোলন, পরিবেশ-আন্দোলন, আশির দশকের পরমাণু-অস্ত্রবিরোধী-আন্দোলন, নব্বই-দশকের যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, কর্পোরেট-বিশ্বায়নবিরোধী গ্লোবাল জাস্টিস মুভমেন্ট, সিয়াটল-আন্দোলন, জেনোয়া-আন্দোলন, কানকুন-আন্দোলন, এবং আজকের একবিংশ শতকের উইকিলিকস-আন্দোলন আর অকুপাই-আন্দোলনের মতো বিশাল বিশাল গণআন্দোলন আর গণজাগরণের সাংগঠনিক প্রাণ-সত্তা ছিল এই ধরনের কোষ-সংগঠন।
 

৩৩.৬ ব্যক্তি-রাষ্ট্র-সমাজ: এ রেভোলিউশন টু লিভ!


মস্কোর প্রগতি-প্রকাশনের পুরাতন পাঠ মোতাবেক একদিন ঘুমের থেকে উঠে হঠাৎ করে বিপ্লব হয় না, চুনী। অ্যানার্কির কাছে আজকের স্বাধীন-সহযোগিতাপরায়ণ সংগঠন-সমবায়ই ভবিষ্যতের স্বাধীনতা-সাম্য-সংহতির সমাজের বীজ। আজকের বীজ গঠিত না হলে, পরিপুষ্ট না হলে, তারপর একদিন উপ্ত না হলে ভবিষ্যত বলশেভিকদের মতো কারাগারে আচ্ছন্ন অন্ধকার। নৈরাজ্য-ভাবনা বা অরাজ-চিন্তা মনে করে, এখন সারাজীবন ধরে হুকুমতন্ত্রের আমলাগন্ধী অনুশীলন করে যাবো, আর হঠাৎ একদিন ‘কোনো এক ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন হুজুর’ বা ‘ইতিহাসের নায়ক’ এসে বিপ্লব করে ফেরার পর আমরা পরের দিন থেকে স্বাধীন-স্বতন্ত্র-পরস্পরনির্ভর সমাজ চালাতে শুরু করব: এটা অলীক চিন্তা।
 
মানুষের বিপ্লব মানুষকেই করতে হয়। তিল তিল করে বিপ্লব রচনা করতে হয়। প্রতিদিন। বিপ্লবের মধ্যেই বাঁচতে হয়। শুধু মিছিল-মিটিং-সভা-সমিতি করে বিপ্লব হয় না। ক্ষমতা-দখল হতে পারে মাত্র। নতুন রঙের, নতুন ঢঙের লাঠিয়াল শাসক শ্রেণী মসনদে আসতে পারে মাত্র। বিপ্লবের জন্য প্রাণবন্ত জীবনযাপন। স্বাধীন, বৈচিত্র্যপূর্ণ, অজস্রমুখী ধারায় জীবনকে প্রতি মুহূর্তে আস্বাদন করা। একা এবং বন্ধু-
দেরকে নিয়ে। একেই বলে ‘এ রেভোলিউশন টু লিভ!’ আজকে যাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য-মাস্টারি-চাকরির জন্য জীবন উচ্ছন্নে দিচ্ছেন, প্রতিযোগিতা-প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের রাজনীতি করছেন, ঘরে ঘরে স্বামী-স্ত্রী-সন্তান-সম্পত্তি-পরকীয়া নিয়ে প্রতিনিয়ত ‘গৃহযুদ্ধ’ করছেন, তাঁরা কালকে বিপ্লব করবেন? কেননা তাঁরা পার্টিকে চাঁদা দেন, মাঝেমধ্যে মিছিল করেন, স্লোগান দেন আর মনে মনে মতবাদের প্রতি অন্ধ ‘ঈমান’ রাখেন বলে ভাবেন? এ কখনো হয়?!

 
কোনো মতে প্রাণ বাঁচানোর বিপ্লব নয় – নতুন জমানার বিপ্লব হচ্ছে বাঁচতে বাঁচতে বিপ্লব। আজকের সিয়াটলের বিপ্লব, জেনোয়ার বিপ্লব, অকুপাইয়ের বিপ্লব গড়ে ওঠে সারা বছর ধরে অজস্র মতপথের অজস্র ছোট ছোট সংগঠনের সার্বক্ষণিক বৈপ্লবিক নেটওয়ার্কিং-কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। আজকের এই যুগ কর্পোরেট দানবের যুগ। এটা ডাইনোসরের যুগ। রাষ্ট্রসোরাস-কর্পোসোরাস-কর্তৃসোরাস-পার্টিসোরাস-আমলাসোরাস-অস্ত্রসোরাসদের যুগ এটা। এবং এটা আবার ‘ডাইনোসরের যুগে অ্যানার্কি’রও (কিউরিয়াস জর্জ ব্রিগেড, ২০০৩) যুগ বটে। এই যুগ আড্ডা নাচ-গান-কবিতা-ছবি-সিনেমা-লেখা-কার্টুন-অ্যানিমেশন আর অডিওভিজুয়াল অ্যানার্কির যুগ। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতের বেলা ডাইনোসর-দানবেরা যখন ঘুমায়, তখন কোথায় যেন মিটিমিট করে জোনাকির মতো আলো জ্বলে। ছোট্ট ছোট্ট এক ধরনের প্রাণী ডাইনোসরের পায়ের ফাঁকে নাচতে থাকে। ঐ প্রাণীগুলোই মানুষ। এ যুগের বিপ্লব হলো: এ রেভোলিউশন টু ড্যান্স!
 
এই সমাজে আজ সবকিছুই রাষ্ট্র হয়ে গেছে। আমলা-কমিটি হয়ে গেছে। মন্ত্রিসভা হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি হয়ে গেছে। কর্তৃত্ব দূষিত করছে গোট সমাজজীবন, সমাজশক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ। আত্মকর্তৃত্ব। আত্মশক্তি। তথা স্বাধীনতা। কিন্তু রাষ্ট্র তো কোনো চেয়ার-টেবিল-মসনদ না যে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলা যাবে। রাষ্ট্র একটা হুকুমতান্ত্রিক সম্পর্কপ্রণালী। রাষ্ট্র একটা ‘আইনসম্মত’ জীবনপ্রণালী। আমরাই তো রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সম্পর্কপ্রণালী মোতাবেক জীবনযাপন সম্মতি প্রদানের মধ্য দিয়ে আমরাই একে টিকিয়ে রেখেছি। রাষ্ট্রকে, তথা রাজনৈতিক সম্পর্করাজিকে, প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে শুধুমাত্র আরেক ধরনের সম্পর্কপ্রণালী দিয়ে। সামাজিক সম্পর্কপ্রণালী দিয়ে।4 তারই জন্য আরোপিত ও মৃত অক্ষরের ‘আইনের’ বদলে আমাদের চাই আত্মীয়তার বিনিসুতার মালা। হুকুমের বদলে চাই আত্মকর্তৃত্ব ও পরস্পর-সহযোগিতা। দালিলিক চুক্তির বদলে চাই প্রেম-ভালোবাসা-বন্ধুত্ব: মুক্ত মানবিক সম্পর্ক। আজকের বিপ্লব মানে নিজের মতো বাঁচো। একা এবং একত্রে। নতুন সমাজ গড়ো। নতুন সংগঠন গড়ো। নতুন সম্প্রদায় গড়ো। প্রেমে পড়ো। আড্ডা মারো। জীবনকে ভালোবাসো। রিক্লেইম দ্য স্ট্রিট। স্ট্রিট-পার্টি আয়োজন করো। এনক্রিপশন অকুপাই করো। কম্পিউটার অকুপাই করো। তার জন্য ক্রিপ্টো-পার্টি আয়োজন করো। মোড়ল নয়, মুরুব্বি নয়, মোল্লা নয়, মিডিয়া নয়, মতবাদ নয়: ডু ইট ইওরসেল্ফ। নিজের জীবন নিজের দখলে নাও।
 
তাই বলছি: ভিন্নমত নিয়ে একসাথে কাজ করতে পারা, জীবনযাপন করতে পারাই স্বাধীনতার চ্যালেঞ্জ। বন্ধুত্বের চ্যালেঞ্জ। মনুষ্যত্বের চ্যালেঞ্জ। ভিন্নমতের জন্য কিংবা মতবাদের জন্য, যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে বলতে হবে জ্যান্ত মানুষের চেয়ে মৃত মতবাদই বড়। আমি জানি তুমি তা মনেও করো না। মনে করতে পারো না। কারণ তুমি হাবিবুজ্জামান চুনী। সুতরাং নিঃসঙ্কোচে আমি কিছু বলে ফেলতে পারলাম।
 
ভালোবাসা জেনো। ভালোবাসাই বন্ধুত্ব। ভালোবাসাই বিপ্লব। ভালোবাসাই জীবন – এ রেভোলিউশন টু লিভ!
 
 
দৈনিক সোনার দেশ , ১২ই এপ্রিল ২০১৩
দৈনিক বণিক বার্তা, ২০শে এপ্রিল
 
পাদটীকা
 
কিউবার বিপ্লব কিন্তু আলাদা পদার্থ ছিল। ওটা চে’র বলিভিয়া-অভিযানের মতো গণবিচ্ছিন্ন বস্তু নয়। এটা ছিল দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা গণবিপ্লব। মূলত জাতীয়তাবাদী বিপ্লব। অজস্র শক্তি ও দল তাকে রূপায়িত করেছিল। পরে রুশ-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের চাপে এবং চে’র দূতিয়ালিতে কিউবা বলশেভিক রাশিয়ান সাম্রাজ্যের পেটের ভেতর ঢুকে যায়। ক্যাস্ত্রো মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শাস্ত্রধর্ম গ্রহণ করেন বিপ্লবের অনেক পরে।
 
জিম মরিসনের গান: এ ফ্রেন্ড ইজ সামওয়ান হু লেটস ইউ হ্যাভ টোটাল ফ্রিডম টু বি ইওরসেল্ফ ...

 
‘সভা’র আদি এবং বুৎপত্তিগত অর্থ হলো: যেখানে সবাই সমভাবে ‘ভাত’ বা ‘প্রতিভাত’ তথা ‘আলোকিত’ থাকেন। কেউ আলাদা কোনো সিংহাসন-চেয়ারে বসেন না। কোনো কর্তা-কর্তৃপক্ষ অন্যের ওপর ছড়ি ঘোরান না। আজকের মতো সভার লাইমলাইট শুধু বিশেষ হুজুরদের ওপর ফোকাস করা হয় না। ‘সমিতি’ কথাটার বুৎপত্তিগত অর্থ হলো: ‘সহ (সমান) মিত যাহার’; ‘সমপরিমাণ’ (অর্থাৎ সমমাপের)। সমিতি তাহলে এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে সকলের পরিমিতি বা মূল্য সমজাতীয়। অন্য দিকে ‘সঙ্ঘ’ প্রসঙ্গে বুদ্ধসঙ্ঘের কথা স্মরণ করা যেতে পারে, যেখানে গুরুশিষ্যের সমঅধিকার ছিল, সমান ভোটের ব্যবস্থা ছিল। এ প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ‘সংঘ ও নিয়তি’ প্রবন্ধটি। সাথে বলে রাখি বাংলায় ‘আড্ডা’ শব্দটার মূল অর্থ: ‘সমবেত হওয়া; একসঙ্গে মেলা’; ‘কার্য্যবিশেষের নিমিত্ত তৎসংক্রান্ত লোকদিগের সম্মিলনস্থান’। (শব্দার্থগুলোর জন্য হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, ১৯৯৬-ক এবং হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, ১৯৯৬-খ দ্রষ্টব্য।)
 
রাষ্ট্র বিষয়ক এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য দ্রষ্টব্য জামান নৈরাজ্যপথিক গুস্তাভ ল্যানডাওয়া’র রেভোলিউশন অ্যান্ড আদার রাইটংস্ শীর্ষক রচনাসংগ্রহের ১৯১০ সালের ‘উইক স্টেটসমেন, উইকার পিপল্’ প্রবন্ধটি – গুস্তাভ ল্যান্ডাওয়া, ২০১০।
 
Test line for probable error message.
 
 

 
 
 
 
 
Logo